সাইনোসাইটিস হলো সাইনাসের সংক্রমণ। সাইনাস হলো মুখমণ্ডলের হাড়ের ভেতরে থাকা বায়ুভর্তি ছোট ছোট গহ্বর, যা নাকের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সাধারণ অবস্থায় এই গহ্বরগুলো শ্লেষ্মা তৈরি করে এবং তা নাকের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। কিন্তু সংক্রমণ এর কারণে সাইনাসের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে শ্লেষ্মা জমে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাকেই সাইনোসাইটিস বলা হয়।
সাইনোসাইটিস যে কোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। এটি স্বল্পমেয়াদি অথবা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সাধারণত ৪ সপ্তাহের কম সময় থাকলে একিউট এবং ১২ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় স্থায়ী হলে ক্রনিক সাইনোসাইটিস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাইনোসাইটিসের লক্ষণ
সাইনোসাইটিসের লক্ষণ বিভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলোঃ
- নাক বন্ধ হয়ে থাকা
- ঘন হলুদ বা সবুজ রঙের নাকের সর্দি
- কপাল, গাল বা চোখের চারপাশে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা
- মাথাব্যথা
- গন্ধ কম পাওয়া বা না পাওয়া
- গলায় কফ নেমে যাওয়া
- কাশি, বিশেষ করে রাতে বেড়ে যাওয়া
- মুখে দুর্গন্ধ
- দাঁতের উপরের অংশে ব্যথা
- জ্বর (কিছু ক্ষেত্রে)
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা
যদি এই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে থাকে অথবা বারবার ফিরে আসে, তাহলে অবশ্যই একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সাইনোসাইটিস কেন হয়?
সাইনোসাইটিসের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমনঃ
- ভাইরাসজনিত ঠান্ডা বা ফ্লু
- ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ
- অ্যালার্জিক রাইনাইটিস
- নাকের ভেতরে পলিপ
- নাকের হাড় বাঁকা
- দূষিত পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকা
- ধূমপান বা পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
- দাঁতের কিছু সংক্রমণ
সাইনোসাইটিসের ঝুঁকির কারণ কাদের?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সাইনোসাইটিস হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। যেমনঃ
- দীর্ঘদিন অ্যালার্জিতে ভোগা
- হাঁপানি রোগী
- নাকে পলিপ থাকা
- ধূমপায়ী
- বারবার সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়া
- দূষিত বা ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশে কাজ করা
সাইনোসাইটিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসা ইতিহাস মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজন হলে নিম্নলিখিত পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেনঃ
- নাক ও সাইনাস পরীক্ষা
- ন্যাসাল এন্ডোস্কপি
- সিটি স্ক্যান
- অ্যালার্জি পরীক্ষা
- প্রয়োজনে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা
সাইনোসাইটিসের চিকিৎসা
সাইনোসাইটিসের চিকিৎসা নির্ভর করে এর লক্ষন, স্থায়িত্ব এবং রোগের তীব্রতার ওপর। চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারেঃ
ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
চিকিৎসক রোগের ধরন অনুযায়ী কিছু ওষুধের পরামর্শ দিতে পারেন। যেমনঃ
- ব্যথা ও জ্বর কমানোর ওষুধ
- নাকের স্টেরয়েড স্প্রে
- স্যালাইন ন্যাসাল স্প্রে বা ন্যাসাল ওয়াশ
- অ্যালার্জির ওষুধ (প্রয়োজনে)
- ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়।
জীবনযাপনের পরিবর্তন
সাইনোসাইটিসের উপসর্গ কমাতে কিছু অভ্যাস আপনার সহায়ক হতে পারেঃ
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া
- ধূমপান এড়িয়ে চলা
- ধুলাবালি ও দূষিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকা
- প্রয়োজনে বাষ্প গ্রহণ করা
- নাক পরিষ্কার রাখতে স্যালাইন ব্যবহার করা
অস্ত্রোপচার
যদি দীর্ঘদিনের ক্রনিক সাইনোসাইটিস ওষুধে নিয়ন্ত্রণ না হয় অথবা নাকে পলিপ বা কাঠামোগত সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসক এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারির পরামর্শ দিতে পারেন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরিঃ
- ১০ দিনের বেশি উপসর্গ অব্যাহত থাকলে
- বারবার সাইনোসাইটিস ফিরে এলে
- তীব্র মাথাব্যথা বা চোখ ফুলে গেলে
- চোখে ঝাপসা দেখা দিলে
- উচ্চ জ্বর থাকলে
- মুখমণ্ডলে তীব্র ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে
সাইনোসাইটিস প্রতিরোধের উপায়
যদিও সব ক্ষেত্রে সাইনোসাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারেঃ
- নিয়মিত হাত ধোয়া
- ঠান্ডা-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়ানো
- অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখা
- ধূমপান থেকে বিরত থাকা
- ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখা
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- প্রয়োজনে নাক পরিষ্কার রাখতে স্যালাইন ব্যবহার করা
উপসংহার
সাইনোসাইটিস একটি সাধারণ রোগ কিন্তু অবহেলা করলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণ হতে পারে। নাক বন্ধ থাকা, মুখে চাপ অনুভব করা, দীর্ঘদিন সর্দি বা মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা সাধারণ ঠান্ডা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষই সুস্থ থাকতে পারেন।

